হারিয়ে যাচ্ছে স্বপ্নীল আগামী

অরণ্য সৌরভ:
মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের এক অনন্য সৃষ্টি অন্নদামঙ্গল। এই অন্নদামঙ্গলের একটি উক্তি এমন ছিল “প্রণমিয়া পাটনি কহিছে জোড় হাতে…আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে”। কথাটি কবি হয়ত সেই সময়ে একটি রূপক আকারে একজন মাঝি চরিত্র ঈশ্বরী পাটনীর মনের সুপ্ত ইচ্ছা হিসেবে তুলে ধরেছিলেন দেবী অন্নপূর্ণার কাছে। কিন্তু খুব গভীরভাবে যদি কথাটি আমরা অবলোকন করি তাহলে দেখতে পাব, হয়তোবা এই ছোট্ট কিন্তু আবেগপূর্ণ চাওয়াটা প্রায় প্রত্যেক মা-বাবার ক্ষেত্রে তার সন্তানের জন্য প্রযোজ্য। পিতা-মাতার কাছে তার সন্তান অপেক্ষা মূল্যবান জিনিস হয়তবা  কিছু হয় না; হোক না সে পিতামাতা উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নবিত্ত। কিছু কিছু বিচ্ছিন্ন ক্ষেত্র বিশেষ বাদ দিলে দেখা যাবে; যে কোন শ্রেণীর পিতা-মাতার সন্তানকে ঘিরে আবেগ একই। পরিমাণ কোন জায়গায় কিছুটা কম, কোন জায়গায় পরিমাণে অনেক বেশি। পক্ষান্তরে, পৃথিবীতে এই সন্তানগুলোই সমাজের কাছে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ধরা যাক, উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের কোন পরিবারের সন্তানের কথা, তাদের প্রতিদিনকার কাজের মধ্যে ঘুম থেকে ওঠা, মা-বাবার সাথে স্কুলে যাওয়া, স্কুল থেকে ফিরে এসে কিছু সময় আরাম করার ছলে খেলতে যাওয়া বা কার্টুন দেখা, ফিরে এসে আবার স্কুলের যাবতীয় হোমওয়ার্ক করা, এরপর রাতের খাবার খেয়ে ঘুমাতে যাওয়া প্রভৃতি কাজ প্রায় বাঁধাধরা নিয়মে পড়ে। কিন্তু আমাদের সমাজে এসব শিশু বাদেও এমন কিছু শ্রেণীর শিশু রয়েছে, যাদের কাছে এরকম জীবন কল্পনাতীত। নিম্নবিত্ত সমাজের অবহেলিত শিশু শ্রেণীর কাছে এ যেন এক রূপকথার গল্প। যখন তাদের স্কুলের যাওয়ার বয়স, তাদের সকালে ঘুম থেকে উঠে স্কুলের শিক্ষকের বদলে হাজিরা দিতে যেতে হয় মালিকের কাছে “মালিক আমি আইলাম”! এরপর শিক্ষকের স্থলে মালিকের প্রত্যুত্তর হয় “লেগে যা কাজে” !

আমাদের সমাজের এই করাল বাস্তবতার অপর নাম শিশুশ্রম এবং আর দশটা উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত শিশুদের সাথে পার্থক্য তাদের পরিচয়ে, কারণ তারা শিশুশ্রমিক। এদের দেখা কোথায় পাওয়া যায়না বলতে পারবেন? কারও গার্মেন্টসে গেলে দেখা মিলবে, কারও দেখা মিলবে লোহার ঝালাইয়ের দোকানে  গেলে, কারও ইটের ভাটাতে, কারও দেখা পাওয়া যাবে পেপার বিক্রেতা হিসেবে আবার কারও চায়ের দোকানে সাহায্যকারী হিসেবে। অপরদিকে, বয়সের জরিপ করতে গেলে দেখা যাবে, ৫ বছর বয়সী ছেলে চায়ের দোকানে চা দিয়ে বেড়াচ্ছে অথবা ৮ বছর বয়সী কেউ নিজের স্বাস্থ্যের ঝুঁকি নিয়ে লোহা ঝালাইয়ের কাজ করছে। কেন করছে এগুলো তারা, কখনও কি আমরা তাদের এই প্রশ্নটা করে দেখেছি? উপরন্তু আমাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক মানুষ রয়েছে যারা এদের অপরিপক্ব কাজের ধরণ দেখে আবার দোকানদারকে বলে আসে “এই অমুকের বাচ্চাকে কি দেখে রেখেছেন, সময় মত চা টেবিলে দিতে পারে না বা টেবিলে চা ফেলেছে আজকে..”! পক্ষান্তরে আমাদের মধ্যে কেউ কি ভেবে দেখে, কেন তারা তাদের শৈশবের রঙ্গিন স্বপ্ন, ছেলেবেলার ক্ষুদে ক্ষুদে ইচ্ছাগুলোকে জলাঞ্জলি দিয়ে পরের তত্ত্বাবধানে কাজ করছে? তারা তো কখনও ভাবেনি তাদের ভবিষ্যতের সূচনা চায়ের দোকানে বা ইটের ভাটাতে বা লোহার ঝালাইয়ের দোকানে শ্রমিক হিসেবে হবে! এই বয়সে কেন তারা আসে শ্রমিক হিসেবে? সোজাসাপ্টা উত্তর হবে, পেটের তাগিদে আসে। শরীরের অন্য অংশ সহানুভূতিশীল হলেও পেট যে অত্যন্ত ব্যতিব্যস্ত প্রকৃতির। মানুষ তাদের পৃথিবীর বুকে বোঝা মনে করলেও, এমনকি তাদের মাঝ পথে ছেড়ে গেলেও তারা তাদের ছোট্ট কাঁধটিতে পরিবারের সদস্যদের মুখে ভাত তুলে দেয়ার সংকল্প নিয়েছে, তাদের রঙিন স্বপ্নগুলো উৎসর্গ করে। সুতরাং তাদের কাছে একমাত্র পথ অবশিষ্ট থেকে যায়, রোজগার করতে হবে শুধু দুই মুঠো ভাতের জন্য, শ্রমিক হতে হবে বাঁচার জন্য।

উপমহাদেশ তথা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিশুশ্রমের বর্তমান পরিস্থিতি অনেক বেশি সংকটময়। ইউনিসেফের ২০০৬-০৭ সালের দেয়া তথ্য মতে, বাংলাদেশে ৫-১৭ বছর বয়সী শিশুশ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৭৪ লাখের কাছাকাছি এবং ৫-১৪ বছর বয়সী শিশু শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৪৭ লাখ। যেসকল শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ কর্মক্ষেত্রে শ্রমিক হিসেবে কাজ করে শুধু তাদের সংখ্যাই ১৩ লক্ষের বেশি। অপরদিকে, বাসাবাড়িতে কাজ করা বাচ্চাদের সংখ্যাটাও নেহাত কম নয়, ৪ লক্ষ ২১ হাজার! এদের মধ্যে ৮৩ শতাংশ শিশুকে গ্রামাঞ্চলে কাজ করতে দেখা যায় এবং ১৭ শতাংশ শিশু শ্রমিক শহর কেন্দ্রিক। শিশু শ্রমিকের সংখ্যা এবং চাহিদা কোন অংশে কম নয় কেন জানেন? প্রাপ্ত বয়সী মানুষকে যদি কোন জায়গায় শ্রমের মূল্য হিসেবে দৈনিক গড়ে ৫০-৬০ টাকা যদি দেয়া হয় মালিকের পক্ষ থেকে, তো এসব শিশু শ্রমিককে মালিকপক্ষ দিনে গড়ে ধমকিয়ে ২০-৩০ টাকা দিয়েই দুইগুণ কাজ করিয়ে নিতে পারে অনায়সেই। মালিকপক্ষের ঝুলিতে লাভ থেকে যায় আরও প্রায় ২০-৩০ টাকার মত!

আমরা চাই সেই মালিক পক্ষের উপযুক্ত শাস্তি হউক এবং শিশুদেরকে তাদের স্বপ্নের জীবন মুক্ত আকাশে ঘুড়ি উড়ানোর জীবনে ফিরিয়ে দেয়া হউক। আর যখন তাদেরকে শৈশবে ফিরিয়ে দেওয়া যাবে তখনিই আমরা একটি সুন্দর সমৃদ্ধ সোনার বাংলার আশা করতে পারি। অন্যথায় কোন দিনও আমাদের সোনার বাংলা দেখা হবে না; কল্পনাতীত থেকে যাবে।জয় হউক বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর সকল শিশুদের- যাদের হাতে ধরা দিবে আগামীর সমৃদ্ধ পৃথিবী।

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password