মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে

মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে

মোঃ হাবিব

টাংগাইল, আমি যে শহরে থাকি। আমাদের এই টাংগাইল শহরের মোটামুটি সব কিছুই ভাল। কিন্তু ইদানিং শহরের ভিতরে অটোর মাত্রা বেড়ে গেছে। এমনকি দিন দিন আরো বাড়ছে। এতে শহরের ভিতরে সব সময় জ্যাম  লেগেই থাকে। রাস্তায় চলাচল করতে খুব কষ্ট হয় সবারই। কিন্তু এত অটো বাড়ার কারন কি। সেটা অনেকে না জেনেই অনেক কিছু বলে। মনে করেন একটা ছেলে কলেজে পড়ে বা স্কুলেই পড়ে।তার পরিবারে অর্থের সমস্যা। অনেকেই বলে টিউশনি কর। আসলে মাত্র স্কুলে পড়ে এই বয়সে কে তাদের বাচ্চা পড়াতে দেবে এদের কাছে। আবার ছোট কোন কাজ করতে গেলেও সেখানে রেফারেন্স ছাড়া কাজ হয় না। তখন দেখা যায় এই ছেলে গুলো এই কাজ করে।অটো চালায়,বিভিন্ন দোকানে থাকে। আরো অনেক কিছুই করে। নিজের খরচ চালানোর জন্য পাশাপাশি পরিবারকে সাহায্য করার জন্য। অন্য বিষয়ে নাই বা বললাম। যাই হোক আমি তৌফিক। আমার বাসা টাংগাইল। আর আমি অনার্স ২য় বর্ষে পড়ছি। পাশাপাশি টিউশনি করি নিজের খরচ চালানোর জন্য। আজকে ২০১৭ সালের এস এস সি পরীক্ষার রেজাল্ট বের হয়েছে। আমারও কিছু ছাত্র ছাত্রী এস এস সি পরীক্ষা দিয়েছে। তাদের রেজাল্ট আল্লাহর রহমতে ভালই হয়েছে।.
আসল ঘটনাটা বলি আজকে দুপুরে আমি একটা কাজ সেরে বাসার দিকে যাব। একটা অটো আসল। অটোতে উঠলাম খেয়াল করলাম অটো
চালক ১৬ বা ১৭ বছরের ছেলে। আমি আর কিছু না ভেবে ফোনে কথা বলছিলাম। কিছুক্ষন আগেই রেজাল্ট বের হয়েছে তাই আমার ছাত্র ছাত্রীরা আমাকে ফোনে বলছিল।সবাই অনেক খুশি কারন সবার রেজাল্টই ভাল হয়েছে। ফোনে কথা শেষ হওয়ার পর দেখলাম ঐ ছেলেটা মানে অটোর চালক আমাকে বলছে।

 ছেলেটা: আপনি কি কোন স্কুল বা কোচিং এর স্যার?

 আমিঃ না, এইতো লেখাপড়ার পাশাপাশি কিছু টিউশনি করি।

 ছেলেটাঃস্যার যদি কিছু মনে না করেন তাহলে একটা রোল নম্বর বলি একটু দেখবেন রেজাল্ট কি। (ছেলেটার কথা শুনে মনে হচ্ছিল ভদ্র ঘরের ছেলে।কথা বার্তার ধরন ভালই। আবার এটাও জানে যে ফোনের মাধ্যমে রেজাল্ট দেখা যায়)

আমিঃ হ্যা অবশ্যই।রোল কত বল।(ছেলেটা রোল নম্বর বলল।রেজাল্ট দেখে আমি নিজেই খুশি হয়ে বললাম রেজাল্ট “A+”)

ছেলেটাঃ ধন্যবাদ স্যার রেজাল্ট দেখে বলার জন্য, (ছেলেটাকে দেখে অনেক খুশি খুশি মনে হচ্ছিল)

আমিঃ ধন্যবাদের কি আছে, আচ্ছা রেজাল্টটা কার। তোমার কোন আত্মীয়র। কিন্তু সে যেটা বলল আমি সেটা শুনে পুরো অবাক হয়ে গেলাম!

ছেলেটাঃনা  স্যার এটা আমার রোল নম্বর। আমার রেজাল্ট। আমি এস এস সি পরীক্ষা দিয়েছি।

আমিঃ বল কি।এস এস সি পরীক্ষা দিয়ে তুমি অটো চালাচ্ছ। এটা ভাবা যায় কিন্তু অটো চালিয়ে লেখাপড়া করে তুমি “A+”পেয়েছ।
এটা একদম অবাক করা বিষয়।

আমিতো লেখাপড়া করেছি আবার টিউশনিও করি আমি বুঝি।আমিতো বুঝি এই বয়সে কি রকম লাগে। আর তুমি লেখাপড়ার পাশাপাশি কাজ কর তবুও এত ভাল রেজাল্ট। ছেলেটাঃ আসলে স্যার পরীক্ষার আগে মাঝে মাঝে অটো চালাতাম।যখন টাকার দরকার হত।আমার পরিবারে আমিই বড় ছেলে। বাবা যে ইনকাম করে তাতে সংসার ভাল ভাবে চলে না। তাই নিজের পড়ালেখার খরচ নিজেই চালাই।কিন্তু কলেজে ভর্তি হতে অনেক টাকা লাগবে তাই এখন নিয়মিত চালাই।

আমিঃ তোমার রেজাল্টতো অনেক ভাল হয়েছে। তো কোথায় ভর্তি হবে ভাবছ। ছেলেটাঃ আসলে স্যার আমাদের মত ছেলেদের ভাবলে কাজ হয় না।রেজাল্ট যত ভালই হোক সরকারী কলেজেই ভর্তি হতে হবে।কারন অন্য কলেজের খরচ চালাতে পারবোনা।

এর মধ্যেই বাসার কাছে চলে আসলাম।অটো থেকে নেমে ১০ টাকার ভাড়া আমি ২০০ টাকা দিলাম। দিয়ে বললাম বাসায় ১ কেজি মিষ্টি নিয়ে যাও। সবাইকে নিয়ে আজকের দিনটা আনন্দ কর। কিন্তু সে টাকাটা
নিতে চাইল না। আর বলল স্যার আনন্দের কিছু নেই।এটা আমার জীবনের প্রথম ধাপ পার হলাম। জীবনে আরো অনেক ধাপ বাকি আছে।
আমি তার কথা শুনে মুগ্ধ হয়ে গেলান। ছেলেটা এইটুকু বয়সেই বাস্তবতা কি সেটা বুঝে গেছে। আসলে মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেদের অনেক কম বয়সেই এটা শিখতে হয়।

সে টাকাটা নিতে চাইল না। কিন্তু আমি জোর করেই টাকাটা দিলাম।বললাম মনে কর আমি তোমার বড় ভাই হিসেবে তোমার রেজাল্টে খুশি হয়ে টাকাটা দিলাম। তখন সে নিল।আর অনেক ধন্যবাদ দিল। পরে আমি বাসায় চলে আসলাম। বাসায় এসে ভাবতে লাগলাম।হায়রে দুনিয়া অন্য কত ছেলে মেয়েরা বাবা,মায়ের আদর পেয়ে বড় হয়। যখন যা চায় তাই পায়।২-৩ টা প্রাইভেট পড়ে।

তবুও রেজাল্ট একটু খারাপ হলেই পরিবারের কথা না ভেবে বিভিন্ন দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে। আমি মনে করি এদের মত বোকা আর কেউ নেই। এই একটা রেজাল্ট এর কারনে এই সব কাজ করে। আর যারা কষ্ট করে লেখাপড়া করে,জীবন চালায়। তারা বুঝে জীবনের কি মূল্য। তারা কষ্ট করে জীবনকে সুন্দর করে গড়ে তুলে। তারা এই একটা পরীক্ষার কথা ভেবে বসে থাকেনা।

 

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password