অনাথ..

অনাথ

শামীম শিকদার, গাজীপুরঃ

রাই ছোট একটি মেয়ে সবে মাত্র ক্লাস ফোরে পড়ে। বাসার পাশেই তার স্কুল তবু তার মা তাকে রোজ স্কুলে নিয়ে যায় এবং নিয়ে আসে। রাই একাই স্কুলে যেতে পারে কিন্তু সে যাবে না কারন মা সাথে না গেলে নিত্য নতুন বায়নাগুলো ধরবে কার সাথে? বাবা মহা ব্যস্ত বাসায় ঠিক মত দু চারটি কথাও বলতে পারে না স্কুলে নিয়ে আসা তো দূরের কথা। তবে একেবারে যে স্কুলে নিয়ে যায় না তা নয়, প্রায়ই অফিসে যাওয়ার পথে স্কুলের গেটের সামনে নামিয়ে বলে আম্মু তোমার স্কুল চলে এসেছে সেও লক্ষী মেয়ের মতো করে স্কুলের ভিতরে চলে যায়। কিন্তু মা যদি সাথে আসে তবে এ চকলেট ও চকলেট, আইসক্রিম, বেলুন, নতুন নতুন খেলনা ইত্যাদি নেওয়ার বায়না।
রাইয়ের বড় একটি বোনও আছে সে ক্লাস নাইন এ পড়ে। ছাত্রী হিসেবে তার কোন তুলনা নেই। নিয়মিত বাড়ির কাজ সহ ক্লাসের সকল পড়াই সাথে সাথে শেষ হয়ে যায়।  রাইয়ের মতো তার বায়নাটাও একটু বেশি তবে তা অনেকটা ভিন্ন রকমের। প্রায়ই স্কুল থেকে এসে শোফাতে বসে পড়ে কাঁদ থেকে ব্যাগও খুলে না তা মার টেনে হেচরে খুলতে হয় এমনকি পায়ের জুতা সহ মুজাগুলো মা ধিরে ধিরে খুলে দেয়। রাইয়ের বড় বোনটির নাম এলী তার সাথে রাইয়ের খুব মিল।
হঠাৎ করে এলী ও রাইয়ের বাবা অসুস্থ হয়ে গেল। বড় হাসপাতালেও নেওয়া হল কিন্তু ডাক্তার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে তাদের বাবা আর বাঁচবে না কারন তাদের বাবার কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে। তারা দুজন কান্না করতে লাগল। এমন অবস্থায় তাদের মা সিধান্ত নিলেন তাদের বাবাকে কিডনি দিয়ে বাঁচাবে। এ কথা শুনে এলী ও রায়ের কান্নার মাত্রা আরো বেশি বেড়ে গেল। কারন তাদের বাবার সাথে সাথে তাদের মাকেও হারাতে চায় না। খুব কষ্ট হচ্ছে তাদের ভিতরে যেমন কষ্ট হচ্ছে বাহিরে। বার বার অনিচ্ছাকৃত ভাবে চোখের কোনে পানি চলে আসছে। কিন্তু কি লাভ এ পানির। এ পানির তো কোন মূল্য নেই, নেই কোন রকম রং। দুজনকেই অপারেশন থিয়েটারে ডুকানো হলো কয়েক মিনিট পরে সকলে কান্না কাটি করছে রাই ও এলী ঠিক বুঝে উঠতে না পেরে সকলের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে। সবাই খুব যত্ন করে তাদের বাবার দিকে তাকিয়ে আছে তারাও বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। পরে জানতে পারল বাবা আর এ পৃথিবীতে নেই, চলে গেলে অজানা কোন দেশে অজানা কোন শাসকের নতুন রাজ্যে।
বেশ কয়েক দিন মার সেবা যত্নের জন্য
খালামনি তাদের বাসায় ছিল। বাবার মৃত্যুর কষ্ট বুকে চেপে অসুস্থ মাকে নিয়ে সময় কাটে অনেকটা নিরানন্দ। বেশ কিছু দিন মারা গেল অসুস্থ মাও। বিধাতার এ নির্মম পরিহাসে আজ ফুট ফুটে দুটি মেয়ে এতিম অনাথ। তাদের আর নিত্য নতুন বায়না গুলো ধরা হয়না, স্কুল থেকে এসে কখন মা জুতা মুজা খুলে দিবে সে প্রতিক্ষায় বসে থাকতে হয় না। তাদের আজ মা বাবা কেউ নেই কিন্তু চলার প্রতিটি ধাপে ধাপে লুকিয়ে আছে মা বাবার প্রতিটি স্মৃতি যা কখনও ভুলবার নয়। তারা তাদের মা বাবাকে কাছে না রাখতে পারলেও তাদের প্রতিটি স্মৃতিকে খুব যত্ন সহকারে রেখে দিয়েছে। কিন্তু মাঝে মাঝে খুব কষ্ট হয় কারন তাদেরকে সবাই বলে এই মেয়ে দুটি এতিম, অনাথ।

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password