পাখির প্রতি ভালোবাসা

খুরশিদ জামান কাকন, নীলফামারী:

সকাল সকাল বন্ধুরা সবাই এক জায়গায় একত্রিত  হন। তারপর তারা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে পড়েন। প্রতিটি দলে সদস্য সংখ্যা সাত থেকে আট জন। এরপর তারা দল ভেদে উপজেলার আনাচে-কানাচে বেরিয়ে পড়েন। তারা সবাই পাখিপ্রেমিক। পাখির প্রতি তাদের ভালোবাসা অপরিসীম।

পাখি রক্ষায় সর্বস্তরের মানুষকে সজাগ করার উদ্দেশ্যে তারা বিভিন্ন স্লোগানসমৃদ্ধ লিফলেট বিতরণ ও আলোচনা সভা করে আসছেন। বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও হাট-বাজারে তারা এ কর্মসূচি পরিচালনা করছেন। সপ্তাহের নির্দিষ্ট কোনো একদিন তারা এ কাজ করেন। প্রকৃতির দৃষ্টিনন্দন উপকরণ পাখির নিরাপদ আবাসস্থল গড়ে তোলাই তাদের উদ্দেশ্য। তারা দলবদ্ধ হয়ে পাখি রক্ষায় এ কাজ করে যাচ্ছেন। ইতোমধ্যে তারা তাদের উপজেলাকে পাখির সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। এজন্য তারা উপজেলার প্রত্যেকটি গাছে গাছে মাটির কলসি বেঁধে দিয়েছেন। এসব কলসে পাখিরা নিরাপদে বসবাস এবং বংশবিস্তার করে চলেছে। আবার এসব কলসের দেখভালও করেন তারা। কোনো কলস হেলে গেলে তারা তা ঠিক করে দেন। তাদের এলাকায় কাউকে পাখি নিধন করতে দেবেন না বলেও তারা দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। পাখি শিকারকারির বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন তারা। এলাকায় কেউ পাখি শিকার করছে এমন খবর তাদের কানে পৌঁছামাত্রই সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনকে নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন এবং পাখি শিকার রোধ করেন।

প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় পাখির ভূমিকা অনস্বীকার্য়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম উপাদান পাখি। পাখি একদিকে মানুষের সৌন্দর্য পিপাসা মেটায়, অন্যদিকে কলকাকলীতে আনন্দমুখর করে রাখে প্রকৃতিকে। এ কারণে প্রকৃতিতে পাখির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। এ উপলব্ধি থেকেই মানুষের মধ্যে পাখির গুরুত্ব তুলে ধরতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলছেন এই তরুণরা।

‘এসো পাখির বন্ধু হই, সবুজ ও পৃথিবীকে বাঁচাই’ স্লোগান নিয়ে নীলফামারীর সৈয়দপুরে গড়ে উঠা তরুণদের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নাম ‘সেতুবন্ধন’। পাখির নিরাপদ আবাসন গড়ে তোলার লক্ষ্যে সংগঠনটি ২০১৩ সাল থেকে সৈয়দপুর উপজেলাসহ প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে কাজ করে যাচ্ছে। এই সংগঠনের তরুণরা পাখি রক্ষায় গাছে গাছে কলস বেঁধে দিয়েছেন। আর এসব কলসে বাসা বেঁধেছে দোয়েল, বুলবুলি, ঘুঘুসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। তাদের লাগানো এসব কলসে পাখিরা পেড়েছে ডিম, ফুটিয়েছে ছানা। সংগঠটির সদস্যরা পড়াশোনার জন্য পরিবারের দেওয়া টাকা থেকে বাঁচিয়ে এসব কলস কিনে থাকেন। তারা এ পর্যন্ত উপজেলার প্রায় ৬ হাজার গাছে কলস বেঁধে দিয়েছে।

নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার খাতামধুপুর ইউনিয়নের খালিশা বেলপুকুর, কাশিরাম ইউনিয়নের বালাপাড়া, বাঙ্গালীপুর ইউনিয়নের মছে হাজীপাড়া থেকে চৌমুহনী, বাঙ্গালীপুর উচ্চ বিদ্যালয়, শহরের ফাইলেরিয়া হাসপাতাল, খাদ্যগুদাম (সংরক্ষিত এলাকা) কয়ানিজপাড়া, মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়, থানা চত্বর, খানকাহ্ শরীফ, সৈয়দপুর কলেজ, সৈয়দপুর ১০০ শয্যা হাসপাতাল, সামাজিক বনায়ন এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখতে পাওয়া যায় সেতুবন্ধন-এর কর্মীদের লাগানো এসব কলস। বর্তমানে সংগঠটির সদস্য সংখ্যা শতাধিক। শুধু সৈয়দপুরেই নয়, তাদের উদ্যোগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, রাজশাহী জেলার বাঘা উপজেলা, নীলফামারী সদর উপজেলার বড়ুয়া, দিনাজপুরের খানসামা, রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার গাছে গাছে পাখির বাসার জন্য মাটির কলস লাগানো হয়েছে।

সেতুবন্ধনের এ ব্যতিক্রমধর্মী কার্যক্রমের ফলে সংগঠনটি সর্বস্তরের মানুষের কাছ থেকে কুড়িয়েছে, জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে সংগঠনটির প্রতি।

সংগঠনের সভাপতি আলমগীর হোসেনের নেতৃত্বে এ কার্যক্রমে রইজ উদ্দিন রকি, নওশাদ আনছারী, রনি, কাকন, জুয়েল, মাসুদ রানা, বিপু, সাকিব, রিফাত, আকাশ, জাহাঙ্গীর, আদিত্য আরাফাত, আনোয়ার সাহেব, আবু নাহিদ, শিমুল, আরিফ, কুতুবউদ্দিন আলো, বদরুদ্দোজা, জিএম কামরুল হাসান, মাহবুবুল আলম, রবিউলরা হাতে হাত রেখে সেতুবন্ধনের মাধ্যমে তাদের ‘পাখি বাঁচাও, প্রকৃতি বাঁচাও’ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।

কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ সংগঠনের সভাপতি পাখি ও পাখির আবাসস্থল সংরক্ষণে ‘পাখি সংরক্ষণ সম্মাননা-২০১৬’ পুরস্কারে ভূষিত হন। গত বছরের ১৩ নভেম্বর রাজশাহী জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে এ সম্মাননা প্রদানের আয়োজন করে পরিবেশ ও বন মন্ত্রাণালয়ের বন অধিদপ্তর। রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল হান্নানের সভাপতিত্বে আলমগীর হোসেনসহ সারাদেশের ৯২ জনকে এ সম্মানে ভূষিত করা হয়।

আলমগীর হোসেন বলেন, ‘প্রকৃতির প্রাণসঞ্চার করা বিভিন্ন প্রজাতির পাখি আজ বিলুপ্তির পথে। এসব পাখি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। পাখি না থাকলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাছাড়া কৃষিতে পাখিদের ভূমিকা অপরিসীম। তারা ক্ষতিকর পোকামাকড় নিধনে ও চাষাবাদে বড় ভূমিকা রাখছে। পশুপাখির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে আমরা মানুষকে সজাগ করার জন্য স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসায় সভা-সমাবেশ, বিভিন্ন এলাকায় উঠান বৈঠক, কৃষক মাঠ স্কুলে আলোচনা, সাইকেলে র‌্যালি, লিফলেট বিতরণ, দরিদ্রের মধ্যে বস্ত্র বিতরণ, স্থানীয় পত্রিকায় পাখি সম্পর্কে কুইজ প্রতিযোগিতা, সচেতনামূলক নানা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছি।’

তিনি বলেন, ‘সংগঠনের সকলেই যেহেতু স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্র তাই অনেক কষ্টে আমাদের অর্থ সংগ্রহ করতে হয়।’

সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে সহজেই পাখি রক্ষায় সেতুবন্ধনের এ কার্যক্রম সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব জানিয়ে সংগঠনটির সহ-সাধরণ সম্পাদক খুরশিদ জামান কাঁকন বলেন, ‘জানি না আমরা আমাদের কার্যক্রম কতোটুকু সফল করতে পেরেছি। তবে আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। যখন দেখি আমাদের লাগানো এসব কলসে পাখিরা নির্ভয়ে বসবাস করছে এবং বংশবিস্তার ঘটাচ্ছে তখন নিজেদের খুব সার্থক মনে হয়।’

এ প্রসঙ্গে সৈয়দপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ হোমায়রা মণ্ডল বলেন, এটি খুব ভালো ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। তাদের এবং সকলের সহযোগিতায় পরিবেশ ও খাদ্য উৎপাদনে এই উদ্যোগ অদূর ভবিষ্যতে সুফল বয়ে আনবে।

সৈয়দপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার বজলুর রশিদ জানান, সেতুবন্ধনের মাধ্যমে পাখির আবাস তৈরির পাশাপাশি শিকারিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে সকলের নজরে এসেছে। ফলে কেউ আর পাখি শিকার করছে না। পাখি শিকার বন্ধসহ পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে সেতুবন্ধন। আশা করি, অদূর ভবিষ্যতে তাদের দেশব্যাপী পাখি রক্ষার্থে এ ব্যতিক্রমধর্মী কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়বে এবং কার্যক্রমের ফলে এক সময় বাংলাদেশ পাখির নিরাপদ অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে উঠবে।’

রাজশাহী বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ইমরান আহমেদ বলেন, ‘পাখি দেশের সম্পদ। অনুকূল আবহাওয়া, প্রচুর খাবার প্রাপ্তি এবং মানুষের সচেতনতার কারণে পাখি বাড়ছে। কৃষিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার এখন অনেক কমিয়ে আনা হয়েছে, বিপরীতে অর্গানিক সারের ব্যবহার বেড়েছে। পোকা-মাকড়মুক্ত রাখতে কীটনাশক না দিয়ে এখন অনেক জায়গায় আগাছা দিয়ে পাখি বসার জায়গা করে দিচ্ছে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। পাখিরা পোকা মেরে ফসল ভালো রাখছে। এতে পাখির সংখ্যাও বাড়ছে। সেতুবন্ধন পাখি রক্ষায় সংগ্রাম করছে- প্রকৃতির জন্য এটি ভালো উদ্যোগ।

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password