পথশিশু দের প্রতি আমাদের দ্বায়িত্ব!

ওয়াসিম আকরাম শিশির:

শিশুদের মাঝেই সুপ্ত থাকে বিভিন্ন প্রতিভা আর তা মুক্ত প্রাকাশ করা আমাদের নৈতিক দ্বায়িত্ব এবং কতব্য। আর তাদের এই প্রতিভাকে বিকশিত করতে হলে প্রয়োজন শিক্ষা। কারণ এরাই হবে  একদিন  দেশ ও জাতির ভবির্ষত।  শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি কখনও উন্নতি সাধন  করতে পারে না।ছিন্নমূল অধিকার বঞ্চিত শিশুকে আত্মশক্তিতে বলীয়ান করে তুলতে চাই উপযুক্ত শিক্ষা ও পরিবেশ।

শিশুদের ছোটকাল থেকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে না পারলে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। এবং তারা দেশের জন্য ঝুকি হিসেবে বেড়েউঠবে! একটি দেশের সুশিক্ষিত লোকেরাই একটি জাতি বা দেশকে সঠিক পথে পরিচালনা করার পরিকল্পনা বা সঠিক দিক নির্দেশনা দিতে পারে। তাই প্রতিটি দেশই তার নাগরিকদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার জন্য উপযুক্ত শিক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করে থাকে। আমাদের দেশেও সরকারিভাবে শিক্ষার জন্য বারবার বলা হলেও বাস্তবে তা কাজে আসছে না। তার কারণ আমাদের দেশ অর্থনৈতিকভাবে এখনও সচ্ছল হতে পারেনি। যদিও বলা হয়ে থাকে দেশ অর্থনৈতিক ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। হ্যাঁ এগিয়ে যাচ্ছে দেশের একটি মহল। যাদের আছে ভুঁড়ি ভুঁড়ি তারাই এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। আমাদের দেশে যে সব ছিন্নমূল বা ভাসমান শিশুর রয়েছে তাদের খবর কে রাখে? তারা তো লেখাপড়া থাক দুরের কথা পেট পুরে দুবেলা খাবার খেতে পারে না। পরতে পারে না কোনো ভালো মানের কাপড়-চোপড়। এর একটাই কারণ অভাব-অনটন। আমাদের দেশের বেশিরভাগ লোক এখনও দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। তাদের সংসারে অভাব অনটন লেগেই থাকে। তারা ছেলেমেয়েদের ঠিকমতো খাবার ও অন্যান্য মৌলিক অধিকারের সুযোগ-সুবিধা দিতে পারে না। ঠিক তখনই এসব শিশুরা জীবন বাঁচানোর তাগিদে সংগ্রামে নেমে বিভিন্ন কাজকর্মে জড়িয়ে পড়ে।

কখনও কুলি, হকার, রিকশা, শ্রমিক, ফুল বিক্রেতা, আবর্জনা সংগ্রাহক, হোটেল শ্রমিক, বুনন কর্মী, মাদক বাহক, বিড়ি শ্রমিক, ঝালাই কারখানার শ্রমিক ইত্যাদিসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে তারা নিয়োজিত হয়।যা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য হুমকিস্বরূপ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আমাদের অযত্ন, অবহেলা, উপযুক্ত পরিবেশ ও শিক্ষা সুযোগের অভাবে তারা যেন কখনই ঝরে না যায় সেদিকে আমাদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি শহরে দেখা যায়, ০৫-১০ বছরের শিশুরা রাস্তার পাশে সংরক্ষিত ডাস্টবিন বা ময়লার ড্রেন থেকে পচা ময়লাযুক্ত খাবার নিয়ে খাচ্ছে, যেখানে সাধারণের চলাচলের অযোগ্য, সেখানে ক্ষুধার জ্বালায় নিমগ্নে খাবার খেয়ে যাচ্ছে অসংখ্য ছিন্নমূল শিশুরা। তারা যে খাবারগুলো ডাস্টবিন বা ড্রেন থেকে তুলে খাচ্ছে সে খাবারগুলো তাদের মতো কোনো না কোনো মানুষ ফেলেছে। একটি শ্রেণির মানুষ খাবার খেয়ে ফেলে দিচ্ছে আবার আরেক শ্রেণির মানুষ সে খাবারগুলো ডাস্টবিন বা ড্রেন থেকে তুলে খেয়ে কোনো রকম জীবন বাঁচায়। আমাদের সমাজে এমন শিশুর সংখ্যা হয়তো স্বাভাবিক শিশুর সংখ্যার চেয়েও কম নয়। যারা নিজেদের চাহিদা মেটাতে অক্ষম, তারা আজ ঘর ছাড়া, আমাদের এই সমাজ তাদের নামের আগে পথকলি, ছিন্নমূল, ভাসমান ও টোকাই নাম দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তাদেরও তো একটা পরিচয় আছে, জন্মের সঙ্গে সঙ্গে তো আর তারা ছিন্নমূল, টোকাই হয়ে জন্মায়নি। তাদের ছিন্নমূল ও টোকাই বানানো হয়েছে। ছিন্নমূল হওয়ার পেছনে দায়ী কে হবে, আমাদের সমাজ ব্যবস্থা না রাষ্ট্র? অবাক লাগে এর দায়িত্ব আমরা কেউই নিতে চাই না।

তাহলে এরা কারা? কি এদের পরিচয়? বাজার, মন্দির, টার্মিনাল, রেলস্টেশন, নগরীর ফুটপাতে অবাধে তাদের চলাফেরা দেখা যায়। দু’বেলা এক মুঠো ভাতের জন্য তারা চুরি, ডাকাতি, মাদকদ্রব্য সেবন, খুন করা, ভাসমান যৌনকর্মী হিসেবে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে। অথচ তাদের তো একটা পরিচয় আছে, স্নেহভরা মায়ের কোল কি তার নিরাপদ আশ্রয়স্থল নয়। এদিকে আমরা প্রতিবছর ২ অক্টোবর পথশিশু দিবস, ৩০ সেপ্টেম্বর কন্যাশিশু দিবস, ২০ নভেম্বর ঘটা করে পালন করছি? এসব আমরা কার জন্য পালন করছি? সুধী সমাজের যারা বিবেক দুটো হাততালি পাওয়ার আশায় সেই ঘরের দুলালিদের নিয়ে ব্যানার ফেস্টুনের মাধ্যমে মিডিয়ায় প্রচার করে।বাহবাহও তারা কম পায় না।কিন্তু যাদের নিয়ে এ দিবস পালন তারা আজও ফুটপাতেই রয়ে গেল। তাদের জন্য কোনো ব্যবস্থা হয় না।

আমাদের সমাজব্যবস্থা আজও কিছুই করতে পারছে না। আমাদের সমাজে কিছু সরকারি, কিছু বেসরকারি সামাজিক সংস্থা তাদের জন্য এগিয়ে আসলেও সুধী সমাজসহ বিত্তবানদের সহযোগিতা না থাকায় তাদের ভাগ্য আজও পরিবর্তন হচ্ছে না। ফলে আজ ছিন্নমূল বা ভাসমান শিশুরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অনাদরে অবহেলায় মানুষ হচ্ছে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিত্সা ইত্যাদি মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত এ দেশের দরিদ্র ও অসহায় শিশুরা। আজও তাদের রাস্তার পাশে আইসক্রিম খাওয়ার জন্য ঠিকই আহাজারি করতে হয়, এক মুঠো ভাতের জন্য জীবন যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে হয়। আর এ বেঁচে থাকার জন্য বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ডে বিভিন্ন বয়সের শিশুরা জড়িয়ে পড়ছে। ফলে আমাদের আগামীর পথচলার হাতিয়ার সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে না। প্রশ্ন আজ একটাই তাহলে আমরা কাদের নিয়ে সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন দেখব, স্বপ্ন যেখানে ঘূর্ণায়মান লাটিম। আসলে আমরা স্বপ্ন দেখতে ভুলে গেছি। এখন শুধু অন্যের স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি। আসুন না আমরা নিজেই নিজেরা স্বপ্ন দেখি, স্বপ্ন দেখি ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার।

যেখানে আমাদের চলার পথে ছিন্নমূল শিশু, টোকাই বা পথহারা নামে কোনো শিশু থাকবে না। নিজেদের সামান্য দু’মুঠো ভাতের জন্য অপরাধমূলক কাজে লিপ্ত হতে হবে না, মানুষের কাছে হাত বাড়াতে হবে না। আমরা স্বপ্ন দেখি, তাদেরও স্বপ্ন দেখায়, তাদেরও বাঁচার সুযোগ করে দিই। তাদেরও যে বাঁচার অধিকার আছে। আমাদের বিবেক, সেটা আজ বাধাগ্রস্ত। তারা নিজেদের সমাজব্যবস্থা থেকে বাইরে এসে কিছুই করতে পারছে না।ফলে আমাদের যুব সমাজ পথহারা বিবেকহীন মানুষে পরিণত হচ্ছে। এই নিয়ে সমাজ প্রতিষ্ঠা,সুন্দর সমাজ গড়া সম্ভব না। আমাদের দেশের ছিন্নমূল বা ভাসমান শিশুদের উজ্জ্বল ভবিষ্যত্ গড়ে তুলতে হলে আমাদের সবারই এগিয়ে আসতে হবে।এলাকাভিত্তিক যে সব ছিন্নমূল বা ভাসমান শিশু রয়েছে তাদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হলে স্ব-স্ব এলাকার বিত্তবান লোকদের উদ্যোগী হতে হবে দেশের শহর, বন্দর, গ্রামসহ যেখানে এসব শিশুরা রয়েছে তাদের সাহায্যর্থে সরকারের পাশাপাশি এলাকার বিত্তবান, ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।

তাছাড়া দেশে শিশুশ্রম বন্ধে আমরা যত আইন করি না কেন? তার কোনটিই কাজে আসবে না যতদিন না পর্যন্ত আমরা দারিদ্র্য দূরীকরণে শিশুর অভিভাবকদের জন্য আয় বৃদ্ধিমূলক প্রকল্প গ্রহণের পাশাপাশি তাদেরকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে না পারি। বর্তমানে এদেশে শিশুশ্রম প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশীয় সংস্থাগুলি দিনদিন যতই সোচ্চার হচ্ছে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা যেন ততোই বেড়ে যাচ্ছে। এই পেক্ষাপটে এই ভয়াবহ সমস্যা সমাধানে এখনই যুবসমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। এদেশে অনেক এনজিও এবং দেশীয় সংস্থা শিশুশ্রম রোধে বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে নামমাত্র একটি সাইন বোর্ড লাগিয়ে সরকার ও বিদেশি সংস্থার কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে শত শত কোটি টাকা। কাজের কাজ তারা কিছুই করছে না। এ ধরনের সংস্থাকে রুখতে সচেতন যুবসমাজকেই এগিয়ে আসতে হবে। দেশে নামিদামী কিছু সংস্থা বর্তমানে শিশুশ্রম রোধে করণীয় বিষয় শীর্ষক সেমিনার বা সিম্পোজিয়াম করে বিদেশি দাতা প্রতিনিধিদের প্রধান অতিথি বা বিশেষ অতিথি করে তাদের নিকট থেকে আর্থিক সহযোগিতা গ্রহণ করছে ঠিকই কিন্তু শিশু অধিকার রক্ষা না করে নিজেদের অধিকার ভালভাবেই রক্ষা করছে তারা। সমাজে এইসব মুখোশধারী ব্যক্তিদের প্রতিহত করতে ভাল কাজের নায়ক এই তরুণ যুবসমাজকেই এগিয়ে আসতে হবে।

এদেশে প্রতিটি সচেতন যুবসমাজ যদি তাদের নিজ নিজ এলাকায় তাদের সমবয়সী আরো কিছু যুবককে নিয়ে এমন একটি দল গঠন করতে পারে যে দল ঐ সমাজের বিত্তবানদের কাছ থেকে সাধ্যের মধ্যে আর্থিক সহযোগিতা এনে ঐ এলাকার দরিদ্র্য অভিভাবকদের উপার্জনমুখী কর্মের ব্যবস্থা করে দিতে পারে তবে এমনেই শিশুশ্রম বন্ধ হয়ে যাবে। এই কাজের জন্য প্রতিটি সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসতে হবে। এইক্ষেত্রে বিত্তবানদের মনে রাখতে হবে, ঐসব দরিদ্র্য অভিভাবক আপনাদের পরিবারেই অংশ এবং তাদেরকে যেকোন প্রকার সহযোগিতা করাই আপনার কর্তব্য।

সাধারণত প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদীভাঙন,দরিদ্র ঘরে জন্মগ্রহণ এবং অপরিকল্পিত পরিবারের শিশুরাই বেশিরভাগ সুবিধাবঞ্চিত হয়ে থাকে।দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের চরাঞ্চলে আশ্রয়কেন্দ্রে এবং বিভিন্ন শহরে ভাসমান অবস্থায় সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের দেখতে পাওয়া যায় বেশি।দেশের ভাসমান শিশুদের পুনর্বাসন করা আমার ও আপনার সকলের দায়িত্ব।এসব শিশুদের শিক্ষার বাইরে রেখে দেশকে কখনও সামনের দিকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব না। দেশের প্রতিটি নাগরিক সুশিক্ষায় শিক্ষিত হলে দেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। দেশের প্রতিটি ভাসমান শিশু শিক্ষিত হলে তাদের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন দ্রুত গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।

কর্মসংস্থানের জন্য সরকারের পাশাপাশি দেশের বিশিষ্ট শিল্পপতি, বেসরকারি সাহায্যকারী সংস্থাকে এগিয়ে আসতে হবে। শিক্ষা দেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার।ভাসমান শিশুদের সেই অধিকার আদায়ে আমাদের সকলকে এগিয়ে আসতে হবে এবং এসব শিশুদের আগামী ভবিষ্যতের জন্য সুনাগরিক হিসাবে গড়ে তুলার দায়িত্ব নিতে হবে।মানবশিশু জন্মলগ্ন থেকেই সৌন্দর্যপিপাসু। অজস্র মৌলিক জ্ঞান গুণের এক বিশাল সুবিন্যাস মানবশিশুর মাঝে। আর এ সুবিন্যাসের মাঝেই গোছানো আছে পৃথিবীর সব সৌন্দর্য, সব ভবিষ্যত্। তবে বহুকাল থেকে তারা তৃণমূল যেন এখনো পরাধীন, এখনো কাঁদছে ক্ষুধার্ত, বস্ত্রহীন, বসতহীন, শিক্ষাহীন, চিকিৎসাহীন, মাতা-পিতাহীন, পৃথিবীর সৌন্দর্য মানব পথশিশুরা।ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকেই তারা অবহেলা, অনাদর, বঞ্চনা,লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছে ধাপে ধাপে।বাবার কোলের অপার স্নেহ,মায়ের শাড়ির আঁচলে মুখ লুকানোর স্বর্গীয় সুখ তাদের কপালে জোটেনি।দারিদ্র্যের সর্বনিম্নে এদের বসবাস।প্রকৃতি এক নির্দয় খেলা খেলছে এদের সঙ্গে।অথচ আমরাই বলি আজকের শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যত!আমাদের সকলের উচিৎ তাদের প্রতি দ্বায়িত্বশীল হওয়া!

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password