বই পড়ি জীবন গড়ি

সোহায়েল হোসেন সোহেল:

ভালো ছাত্র কখনোই আমি ছিলাম না কিন্তু পড়তে ভালোবাসতাম খুব। নতুন বই হাতে নিয়ে প্রথমে সূচিপত্র দেখা, বইয়ের ছবিগুলো দেখা, তারপর পুরো বই পড়ে ফেলা। মনে আছে থ্রি, ফোরে যখন পড়তাম অধির আগ্রহে অপেক্ষা করতাম স্কুল থেকে কবে বই দিবে সেই দিনটার জন্য। বই হাতে পাবার পর মনে হতো স্কুলের আঙ্গিনায় নুতন বইয়ের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। বই হাতে নিয়েই মলাটের দিকে আবিষ্ট হয়ে বসে থাকতাম কিছুসময়।তারপর শুরু হতো পাতা উল্টানো। মনে হতো বইয়ের পাতায় পাতায় গন্ধ পাচ্ছি। একই বই অথচ অন্যেরটাও একটু নেড়েচেড়ে দেখতাম তারটা কেমন। নতুন বইয়ের গন্ধটা একেবারেই অন্যরকম লাগতো।

কয়েকদিনের ভিতরেই দেশের প্রতিটা স্কুলের ছেলেমেয়ের হাতে নতুন বই উঠবে। নতুন বই হাতে নিয়ে ছেলেমেয়েরা আনন্দ করতে করতে বাড়ি যাবে। খুশিতে লাফিয়ে উঠবে প্রতিটা শিশুর কচি হৃদয়। কি অদ্ভুত এক ভালোলাগা, কি অপূর্ব সেই শিহরণ!

কিন্তু প্রতিযোগীতার আবর্তে পড়ে একটা শিশু খুব দ্রুতই তার নতুন বইয়ের গন্ধ ভুলে যায়। যে হাসি আর আনন্দ নিয়ে নতুন বই বাড়িতে নিয়ে আসে তা ফিকে হতে সময় লাগে না। বাস্তবতা, ব্যস্ততা শিশুর কচি হৃদয়কে দুমড়ে, মুচড়ে দেয়। অভিভাবকরা ছেলেমেয়েদেরকে কোচিং, প্রাইভেটে এতটাই ব্যস্ত রাখে যে নিজের পাঠ্য বইয়ের বাইরে কোন বইয়ের কথা সে চিন্তাই করতে পারে না।

অথচ প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে গেলে সবার আগে প্রয়োজন ভালো বই পড়া। কারণ বই আমাদেরকে চিন্তা করতে শেখায়, ভাবায়, জানতে সহায়তা করে। বিবেককে জাগিয়ে তোলে। বিকশিত করে বুদ্ধি। আকাশ ছুতে আরম্ভ করে ভাবনার ডালপালা গুলো।শিশুর মেধা ও বুদ্ধিবৃত্তিকে শানিত করে। জনৈক দার্শনিক পিয়ারসন স্মিথ’র ভাষায়,‘ যে বই পড়ে না, তার মধ্যে মর্যাদাবোধ জন্মে না।’

প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে হয়তো সহজ করেছে। কিন্তু ভাবনার দুয়ারে অবাধ বিচরণে বাধ সেধেছে একথা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। যেখানে বই আমাদের মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়তে শেখায়। জ্ঞান অর্জন থেকে শুরু করে বিনোদনের সঙ্গীও হতে পারে ভালো একটা বই। বই পড়েই ছেলেমেয়েরা উন্নত চরিত্র গঠনে অনুপ্রাণিত হয়। বই মানুষকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দিয়েছে চিরকাল।

মেধার বিকাশ ঘটাতে পাঠ্যপুস্তকের বাইরে বিভিন্ন বই পড়তে হবে।ক্লান্ত শরীরে স্বস্তির ছোঁয়া খুঁজে পেতে বইকে টেনে নিতে হবে পরম আদরে। ডাচ দার্শনিক স্পিনোজা বলেন,‘ভালো খাদ্যবস্তু পেট ভরায় কিন্তু ভাল বই মানুষের আত্মাকে পরিতৃপ্ত করে।’

বিশাল পৃথিবীর অজানা খবর জানতে মানুষকে সাহায্য করে বই। বই পাঠ করেই মানুষ জগতের প্রকৃত সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের সন্ধান পায়। চিত্ত বিনোদনের পাশাপাশি জ্ঞানের আলোকে আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে বই।

বই পড়ার মাধ্যমে মানুষ বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে এবং অজানাকে জানার আনন্দ লাভ করে। বই সুন্দর ও শুভ চিন্তা-ভাবনার কথা বলে। মনের স্বপ্ন জাগিয়ে তোলে। মনকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করে। সেই আলোয় আমরা ভালো-মন্দ বিচার করতে পারি। স্বার্থপরতা ও মন্দ চিন্তাকে দূর করে ভালো মানুষ হয়ে উঠি। বই মানুষের মনের সকল কপাট খুলে দেয়, দৃষ্টিকে করে প্রসারিত ও সুদূরগামী। দার্শনিক দেকার্তের ভাষায়,‘ভালো বই পড়া মানে গত শতাব্দীর সেরা মানুষদের সাথে কথা বলা।’ অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যে সেতু বন্ধন করে বই। স্রষ্টা, সৃষ্টি, সভ্যতা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইত্যাদি সম্পর্কে পরিচয় পাওয়া যায় বইয়ের মাধ্যমে।

বই পাঠকের মনকে সত্য, সুন্দর ও আনন্দময় অনুভূতিতে ভরিয়ে তোলে। হতাশাগ্রস্ত কিংবা বিভ্রান্ত মানুষকে দেখায় জীবনের সঠিক পথ। বই আমাদের আশা জাগায়, স্বপ্ন দেখায়।

বই অবসর যাপনের উৎকৃষ্ট সঙ্গী। আনন্দের অমিয় ধারায় প্লাবিত করে দিয়ে জীবনকে রাঙ্গিয়ে তুলতে পারে বই। বই পাঠে মনের দিগন্ত উন্মোচিত হয়, হৃদয়-মন ও আত্মা প্রসারিত হয়।জ্ঞানের স্বর্গরাজ্যে প্রবেশের সুযোগ পায়।

বাস্তব জীবনে আমরা বিভিন্ন সময়ে খুব খারাপ সময় পার করি। কখনো বিপদ আসে বাইরে থেকে, কখনো বা বিপদ আসে মনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থেকে। সেই কঠিন মুহুর্তেও জীবনের আলোকবর্তিকা হয়ে বই পাশে দাঁড়াতে পারে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেন ‘বই পড়াকে যথার্থ হিসেবে যে সঙ্গী করে নিতে পারে, তার জীবনের দুঃখ কষ্টের বোঝা অনেক কমে যায়।’
মানুষ অসুস্থ অবস্থায় এবং বার্ধক্যে জরা ব্যাধিতে আক্রান্ত অবস্থায় বড় বেশি নিঃসঙ্গ ও একাকী হয়ে পড়ে। মানুষের সেই নিঃসঙ্গ মুহূর্তে কেবল একটি সুন্দর বই-ই প্রকৃত আনন্দ দিতে পারে, একাকীত্ব দূর করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার আটলান্টায় অবস্থিত এমোরি ইউনিভার্সিটির এক গবেষক গ্রেগরি বের্নস বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রেই গল্প আমাদের জীবনকে গুছিয়ে দেয়। ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব নির্ধারণে সহায়তা করে। একটি উপন্যাস পাঠ মস্তিষ্কের পরিবর্তন ঘটাতে পারে।’

তরুণ সমাজের ভিতর নৈতিকতা ও মূল্যবোধ তৈরি করে একটা সুন্দর সমাজ গঠনে বই হতে পারে সেরা মাধ্যম। সৃষ্টিশীল, জীবনধর্মী, নীতিকথামূলক ও সুপাঠ্য বই পাঠ হতে পারে এর একমাত্র উপায়।

বই মানুষের মনুষ্যত্ববোধকে জাগ্রত করে। মনের প্রসারতার জন্য, হিংসা-বিদ্বেষের উর্ধ্বে থেকে উন্নত ও আনন্দপূর্ণ আদর্শ জীবনের জন্য বইয়ের সঙ্গে সর্ম্পক গড়ে তুলতে হবে। প্রকৃতপক্ষে বইয়ের মতো এমন আনন্দদায়ক সঙ্গী পৃথিবীতে আর নেই।ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন,‘জীবনে তিনটি জিনিসের প্রয়োজন- বই, বই এবং বই।’

তাই শুধু পাঠ্য বইয়ের ভিতরেই নিজেদেরকে সীমাবদ্ধ করে রাখলে চলবে না। জানতে হবে ইতিহাস, পড়তে হবে সাহিত্য, ভ্রমণ কাহিনী, দর্শন, ভূগোল, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, প্রাচীন ঐতিহ্য, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালীদের জীবনী, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, আইন প্রভৃতি বিষয়।
আসুন, আমরা বইয়ের কাছে ফিরি। ছেলেমেয়েদেরকে বই উপহার দিই। তাদের ভিতর বই পড়া প্রতিযোগীতার আয়োজন করি। আমাদের সবার অঙ্গিকার হোক একটাই ‘নতুন বইয়ের গন্ধ শুঁকে ফুলের মতো ফুটব, বর্ণমালার গর্ব নিয়ে আকাশ জুড়ে উঠব’।

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password