শিশুর অধিকার ও আমাদের শিশু

কামরুল ইসলামঃ

আজকের শিশুরাই আগামী দিনের জাতির ভবিষ্যৎ। তারা শারীরিক-মানসিক স্বাস্থ্যে, শিক্ষায়, চিন্তায়-চেতনায় ও মননে যত সমৃদ্ধ হবে জাতির ভবিষ্যৎ তত শক্তিশালী হবে। কিন্তু বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে শিশুদের সার্বিক পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক নয়। দারিদ্রের কষাঘাতে বহু শিশু তাদের বেঁচে থাকার অধিকার, বিকাশের অধিকার, জীবনযাত্রার মান ভোগ ও বিনোদনের অধিকার ইত্যাকার নানা অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকরা অভাবের তাড়নায় তাদের শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ করছেন। আবার ছিন্নমূল শিশুরা পেটের তাকিদে নিজেরাই টোকাই হচ্ছে, ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত হচ্ছে। কোন কোন ক্ষেত্রে নানা অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে। শিশুদের এহেন অবস্থা থেকে রক্ষার আইন আছে সরকারি-বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সনদ ও প্রতিশ্র“তি আছে কিন্তু এগুলো প্রতিপালিত হচ্ছে না। জাতির কর্ণধার, বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজের তাই এই দিকাটায় বিশেষ নজর দেয়া দরকার। দুর্ভাগ্যেও বিষয় আমাদের দেশের এক শ্রেণীর তথাকথিত বুদ্ধিজীবী শিশুদেরকে নৈতিক শিক্ষা দেয়ার বিষয় উপেক্ষা করছেন। যার ফলে শিশুদের কিছু অস্বাভাবিক আচরণও পরিলক্ষিত হচ্ছে। যাহোক, জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে সমাজের সবাইকে একটা ঐকমত্যে আসতে হবে। তাহলেই কেবল জাতির বিপন্ন শিশুদের রক্ষা করা যাবে।

শিশু অধিকার:
শিশু অধিকার সনদে যেসব অধিকারের কথা বলা হয়েছে সেগুলো হলো: ১. শিশুর বেঁচে থাকার অধিকার, যেমন স্বাস্থ্য সেবা, পুষ্টিকর খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ; ২. বিকাশের অধিকার, যেমন শিক্ষার অধিকার, শিশুর গড়ে ওঠার জন্য উপযুক্ত একটি জীবনযাত্রার মান ভোগের অধিকার এবং অবকাশ যাপন বিনোদন ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণের অধিকার; ৩. সুরক্ষার অধিকার, যেমন শরণার্থী শিশু, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন শিশু, শোষণ নির্যাতন ও অবহেলার শিকার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এমন শিশু; ৪. অংশগ্রহণের অধিকার, যেমন শিশুদের স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার, স্বাধীনভাবে কিছু করার অধিকার ইত্যাদি। একটি শিশু যদি এই অধিকারগুলো পায় তাহালে সে তার জীবনকে অনেক উজ্জল করতে পারবে।

শিশুর অপুষ্টি:
বাংলাদেশের শিশুপুষ্টির চিত্র এখনো আশানুরূপ নয়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অভিভাবকের দারিদ্রতার পাশাপাশি অজ্ঞতার কারণেও শিশুরা অপুষ্টিতে ভোগে। এছাড়া খর্বকায়, বয়সের তুলনায় কম ওজনসহ নানা রোগব্যাধিতে ভোগে শিশুরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মানদন্ডের সূচক অনুসারে একটি দেশে শতকরা ৪০ ভাগ বয়সের তুলনায় বেঁটে, শতকরা ৩০ ভাগ বয়সের তুলনায় কম ওজন এবং শতকরা ১৫ ভাগ উচ্চতার তুলনায় কম ওজন হলে মারাত্মক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়। সূচক হিসেবে সবক’টি ক্ষেত্রেই নিচে রয়েছে বাংলাদেশ। অভাবে মধ্যবিত্ত, নি¤œমধ্যবিত্ত এমনকি ধনী পরিবারের শিশুরাও অপুষ্টিতে ভোগে এবং বিভিন্ন সমস্যার কারণে মারা যায়।

খাদ্য নিরাপত্তা ও জাতীয় নজরদারি প্রকল্পের (এফএসএনএসপি) সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, এখনো শিশু পুষ্টিহীনতার উন্নয়নে বাংলাদেশের অগ্রগতি খুব ধীর। এখনো এটি উচ্চহারে অবস্থান করছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধিও হারের আনুপাতিক হিসেবে এটি বরং আরো বাড়ছে। রিপোর্ট অনুযায়ী এই হার ৪৫ শতাংশ অবস্থান করছে। এটি বাংলাদেশের শিশুপুষ্টির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ৬০ শতাংশেরও বেশি পরিবার খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বাস করছে। জাতিসংঘের বিশ্ব পুষ্টি পরিস্থিতি বিষয়ক ষষ্ঠ রিপোর্ট থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের ৪০.২ শিশুই অপুষ্টির শিকার। এদেশে প্রতিদিন ২৫০ জন পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু অপুষ্টিতে মৃত্যুবরণ করে। ইউসেফের তথ্য মতে, দেশে অপুষ্টির শিকার শিশু সংখ্যা প্রায় এক কোটি।

বাংলাদেশ জনস্বাস্থ্য সেবা (বিডিএইচএস) থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ৩৬ শতাংশ বয়স অনুযায়ী কম ওজন সম্পন্ন, ৪১ শতাংশ খর্বকায় এবং ১৬ শতাংশ কৃশকায়।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, জন্ম থেকে পরবর্তী তিন বছর বয়সটা শিশুর শারিরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মস্তিষ্কেও ৭৫-৮০ ভাগ বিকাশ ঘটে এই সময়ের মধ্যে। তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সে ১৫ ভাগ এবং পাঁচ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে অবশিষ্ট ৫ ভাগের বিকাশ ঘটে। অপুষ্টির শিকার শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ঠিকমত হয় না। বিদ্যালয়ে তাদের উপস্থিতির হার কম। সৃজনশীল কাজেও তারা পিছিয়ে থাকে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ পরিবার তিন বেলা খেতে পায় না। পুষ্টিকর খাবার গ্রহণে বঞ্চিতদের মধ্যে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি দিনদিন বাড়ছে। গর্ভকালীন সময়ে মায়েল অপুষ্টিজনিত সমস্যা থেকেই মূলত শিশু পুষ্টিহীনতার শিকার হয়। শিশুর অপুষ্টি ও অপুষ্টিতে মৃত্যুও দুটি প্রধান কারণ হলো সঠিকভাবে মায়ের দুধ না খাওয়ানো এবং সঠিকভাবে পরিপূরক খাবার না খাওয়ানো। দারিদ্রতার পাশাপাশি মা-বাবার অসচেতনতা, সামাজিক কুসংস্কার ও অভ্যাস শিশুর পুষ্টিহীনতার জন্য দায়ী। পুষ্টিহীন শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে। সেকারণে এরা খুব সহজেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়।

শিশু শ্রম:
বিদ্যমান শ্রম আইনে শিশু শ্রম নিষিদ্ধ করা সত্ত্বেও ব্যাপক সংখ্যক শিশু ঘরে ও বাইরে অর্থাৎ কলকারখানা, ওয়ার্কশপ, রেস্তোরাঁ, মিষ্টির দোকান, মোটর গ্যারেজ, বাস ও টেম্পো, নির্মাণ কাজ, চা বাগান, কৃষি ও গৃহকর্মে নিয়োজিত। এসব কাজে নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেই। সরকারের পরিসংখ্যান বিভাগের হিসাব মতে, দেশের মোট শ্রমিকের ১২ শতাংশই শিশু শ্রমিক। কম মজুরি, মাত্রাতিরিক্ত খাটুনি ও ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম নিয়ে উদ্বেগজনক অবস্থায় আছে আমাদের দেশের শিশুশ্রম পরিস্থিতি। শিশুরা এসব কাজে নিয়োজিত থেকে অনেক সময়ই কেবল জীবনধারণের খোরাকি পেয়ে থাকে, যা দয়া-দক্ষিণা বলেও বিবেচিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের কাজগুলো দাসতুল্য বলা হয়। রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দরিদ্র শিশুরা ট্যানারি, প্লাস্টিকের কারখানা, ওয়ার্কশপ কেমিকেল হাউজসহ বাসাবাড়িতে নানা রকম ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করে। এসব কারখানার পরিবেশ তাদেও শারীরিক ও মানসিক বিকাশে যেমন অন্তরায় তেমনি যেকোন মুহুর্তে দুর্ঘটনারও আশঙ্কা থেকে যায়। শিশুদের এসব স্থানে দিনে ১০ ঘন্টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। এসব ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সাথে ধুলিৎসাত হয়ে যাচ্ছে শিশুদের সোনালী ভবিষ্যৎ। পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং আর্ন্তজাতিক শ্রম সংস্থার জরিপ অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রে ঝুঁকি রয়েছে মোট ৪৫ ধরনের কাজে। এর মধ্যে ৪১ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজেই শিশুরা অংশ নিচ্ছে। গত পাঁচ বছরে দেশে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা বেড়েছে ১০ লাখ। মোট শিশু শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৭৯ লাখ। সরকারি হিসেবে দেশে শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে শিশুশ্রমের প্রবণতা অনেক বেশি। শিশু শ্রমিকদের মধ্যে আবার ১৫ লাখ শহরে এবং ৬৪ লাখ গ্রামে কাজ করে। এদের মধ্যে ৭৩ ভাগ ছেলে এবং ২৭ ভাগ মেয়ে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে শিশুশ্রম নিরসনে আইএলও কনভেশন ১৩৮এ অনুস্বাক্ষরের আয়োজন চলছে। শিশুশ্রম বন্ধ করতে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী একটি শিশুকেও তার জীবন নির্বাহের জন্য কোন প্রকার শ্রমে নিয়োজিত করার কথা নয়। কিন্তু বাংলাদেশের আর্থসামাজিক পেক্ষাপটের কারণে শিশুরা শ্রমে জড়িত হয়ে থাকে। একই কারণে অভিভাবক ও মালিক উভয়েই শিশুদের শ্রমে নিয়োজিত করে। কাজেই আর্থসামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমেই কেবল শিশুশ্রম নিরসন সম্ভব হবে আর এ জন্য সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

শিশু আইন:
বাংলাদেশ অতি সম্প্রতি পাস হয়েছে শিশু আইন ২০১৩। এই আইনে বলা হয়েছে কোন ব্যক্তি যদি তার দায়িত্বে থাকা কোন শিশুকে আঘাত, উৎপীড়ন বা অবহেলা করেন তাহলে ঐ ব্যক্তি অনধিক পাঁচ বছরের কারাদন্ড অথবা এক লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন। এই আইন অনুযায়ী এখন থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত সবাইকে শিশু বলে গণ্য করা হবে। মিছিলে, সমাবেশে শিশুদের ব্যবহার করা এখন দন্ডনীয় অপরাধ। শিশুকে ভিক্ষাবৃত্তি বা যৌনপল্লীতে ব্যবহার করা হলে অথবা শিশুদের দিয়ে কোন প্রকার মাদক বা আগ্নেয়ান্ত্র বা অবৈধ কিছু বহন করানো হলে দায়ী ব্যক্তিকে সাজা দেয়া হবে। ইচ্ছে করলেই কোন ধরনের মামলায় নয় বছরের কম বয়সী শিশুদের কোনভাবেই গ্রেফতার করা যাবে না। নয় বছরের বেশি কোনো শিশুকে গ্রেফতার বা আটক করা হলে হাতকড়া বা কোমরে দড়ি পড়ানো যাবে না। এছাড়া যে কোন মামলায় শিশুকে জামিন দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। শিশু সংক্রান্ত মামলা দেখাশুনা করবেন নিয়োগ পাওয়া প্রবেশন কর্মকর্তা আর শিশুর বিচার হবে বিশেষ শিশু আদালতে।

পথ শিশু:
বিবিসির এক জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশের পথশিশুদের বয়স ৩ থেকে ১৮ বছর। এদের সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ। তাদের অধিকাংশই পরিবারের ভাঙনের ফলে পথশিশু হয়ে উঠেছে এবং এই শিশুরা প্রায় সবাই শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। এদের অনেকেই যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তারা পথে ঘাটে অনিরাপদ অবস্থায় থাকে। ১৯৯৭ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক শিশু। এই বিরাট অংশের মধ্যে প্রায় ৬ লাখ শিশু ছিন্নমূল অর্থাৎ পথশিশু। যার মধ্যে ৫৩% ছেলে এবং ৪৭% মেয়ে। এরা স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে না। আবাসচ্যুত অর্থাৎ এদের বাড়িঘর নেই। অনেকের বাবা মা নেই। বিরাট অংশের এই শিশুরা রাস্তায় জীবনযাপন করতে গিয়ে নানা রকম কর্মকান্ডের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলছে। কখনও কখনও নিজেকে জড়িয়ে ফেলছে নানারকম অপরাধজনক কাজেও। কেউ কেউ নেশাগ্রস্ত হচ্ছে। এদেরকে ব্যবহার করা হচ্ছে নানারকম রাজনৈতিক কর্মকান্ডেও।

শিশু অধিকার আইনে বলা হয়েছে, কোন শিশু যদি বিশেষ পরিস্থিতিতে যেমন মা বাবার মৃত্যুও কারণে অথবা মা বাবা ছেড়ে চলে যাওয়ার কারণে কিংবা মা বাবার কাছ থেকে হারিয়ে যাবার ফলে পারিবারিক পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হয় তাহলে সেই শিশুর অধিকার রক্ষার জন্য সরকার বিশেষ ব্যবস্থা নেবে। এক্ষেত্রে সরকার পারিবারিক সুযোগ সুবিধার বিকল্প ব্যবস্থা নেবে অথবা প্রয়োজনবোধে কোন প্রতিষ্ঠানকে এই দায়িত্ব দেবে। কিন্তু ভাগ্যেও নির্মম পরিহাস, এরা যেন আমাদের সমাজের উচ্ছিষ্ট। এদের নিয়ে কারো মাথা ব্যথা নেই। আদমশুমারিতে এদের হিসাবও থাকে না। এরা দেশের নাগরিক হিসেবে পায় না কোন সুযোগ সুবিধাও। এসব শিশু তাই বড় হয়ে উঠছে অযতেœ অবহেলায়। এক জরিপে দেখা যায়, শতকরা ৮৫ জন পথশিশু কোন ধরনের সাহায্য সহযোগিতা পায়না। কোন সরকারি বা বেসরকারি সাহায্য তারা পায় না। ন্যূনতম শিক্ষা কিংবা অধিকারও তারা পায় না। ফলে এই শিশুরা বড় হয়ে সমাজবিরোধী অনেক কর্মকান্ড করে। কিন্তু প্রত্যেক শিশুরই বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে তার বেঁচে থাকা এবং বিকাশের অধিকার নিশ্চিত করে দেয়া।

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password