শিশুর মেধা বিকাশে বাঁধা সৃষ্টি করছে প্রযুক্তি

শিশুর মেধা বিকাশে বাঁধা সৃষ্টি করছে প্রযুক্তি

অরণ্য সৌরভঃ

প্রযুক্তির ব্যবহার কেড়ে নিচ্ছে শিশু-কিশোরদের প্রকৃত শৈশব-কৈশোর। মেধা বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে চরমভাবে। যা জাতির জন্য আর্শীবাদ বয়ে আনতে অক্ষম। দুরন্তপনার এই বয়সে যখন তাদের দৌড়ঝাঁপ আর মাঠে গিয়ে খেলাধুলা করার কথা তখন তাদের কাছে খেলাধুলা আর বিনোদন মানেই হচ্ছে সারাক্ষণ বোতামে হাত আর স্ক্রিনে চোখ।

বিশ্বের শিশুদের মতো বাংলাদেশের শিশু-কিশোরদের মধ্যেও প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রতি আসক্তি বাড়ছে। শিশু-কিশোরদের প্রযুক্তির প্রতি আসক্তি পরিপূর্ণ মানসিক ও শারীরিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

গোপালদী নজরুল ইসলাম বাবু কলেজের মনোবিজ্ঞানের প্রভাষক খাদিজা বলেন, এখনকার শিশু-কিশোররা খেলাধুলা করে না, গল্পের বই পড়ে না, এমনকি কারো সঙ্গে গল্পও করে না। সারাদিন তারা কম্পিউটার বা মোবাইল ফোন নিয়ে পড়ে থাকে। প্রযুক্তি ব্যবহারের মধ্যেই নিজের একটা জগৎ তৈরি করে তারা।

অপরদিকে দেখা যাচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারা কার সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলছে সেটাও বাবা-মায়ের জানার কোনো উপায় থাকে না। একদিকে শিশুটির যেমন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের ওপর নির্ভরতা সৃষ্টি হচ্ছে। অন্যদিকে পরিবার ও পরিজনের কাছ থেকে তার দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে। তখন সে একা থাকতে পছন্দ করছে। দেখা যায়, মানুষজনের মধ্যে থেকেও সে নিজের মতো মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহারে ব্যস্ত রয়েছে। সে নিজের সুখ-দুঃখ, কি করছে, কি পড়ছে, কি খাচ্ছে সেটাও ফেসবুকে তুলে দিচ্ছে। নিজেকে প্রদর্শন করা এবং নিজেকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা এটাও একটি মানসিক রোগ। প্রযুক্তির প্রতি আসক্তি যেমন শিশুদের শারীরিক মানসিক বিকাশে ক্ষতি করছে। অন্যদিকে প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে জঙ্গিবাদ, মাদকসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধে শিশু-কিশোররা জড়িয়ে পড়ছে। কাজেই শিশুদের প্রযুক্তির ব্যবহারের প্রতি আসক্তি দূর করতে জনসচেতনার প্রয়োজন। বাবা-মায়ের যেমন দায়িত্ব তার সন্তানটি কি করছে সেদিকে নজর রাখা। তেমনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও প্রযুক্তি ব্যবহারের সুফল এবং কুফল সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করাতে হবে।

তিনি আরো বলেন, শিশু-কিশোরদের মধ্যে অধিক মাত্রায় ভিডিও গেমস বা ফেসবুক ব্যবহারের কারণে তাদের ভেতরের শক্তি আস্তে আস্তে আসক্তিতে পরিণত হয়। তখন সে রাত জেগে খেলে অথবা ফেসবুকিং করে। এতে করে সকালবেলা সে ক্লাসে গিয়ে মনোযোগ দিতে পারে না। তার মধ্যে মনস্তাত্তি¡ক সমস্যা দেখা দেয়। কারণ ভিডিও গেমস বা ফেসবুক হচ্ছে ভার্চুয়াল লাইফ এটা তো রিয়েল লাইফ নয়। তাই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সে যে সুখ খুঁজে পায় সেটা তো প্রকৃত সুখ নয়। ধীরে ধীরে তার মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। বাবা-মায়ের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে না। সে নিজের বিষয়ে পরিবারকে কিছু জানাতে চায় না। মানুষের সঙ্গে মিশতে চায় না। তার সমস্যা সে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে সমাধান করতে চায়। ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অস্বাভাবিক হয়ে যায়। তখন তার মানসিক গোলযোগ দেখা দেয়। আবেগ ব্যবস্থাপনায় গোলযোগ দেখা দেয় এবং সামাজিক সম্পর্ক রক্ষায়ও গোলযোগ দেখা দেয়। কারণ সে বড় হচ্ছে প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে। সে যখন নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারছে না। তখন সে সমাজের কোনো উপকারে আসতে পারবে না। কারণ সে মনে করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার মত প্রকাশের মধ্য দিয়েই তার দায়িত্ব শেষ। তাদের মধ্যে প্রকৃত দায়িত্ববোধ জাগ্রত হচ্ছে না।

শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জয়নাল আবেদীন বলেন, বিরতিহীনভাবে প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে শিশুদের চোখ ও মস্তিষ্কের মধ্যে চাপ পড়ে। ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি কমে যায়। মস্তিষ্ক সঠিকভাবে কাজ করে না। তারা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কোনো কিছুতে আগ্রহ পায় না। কোনো কায়িক পরিশ্রমের খেলাধুলা তারা করতে চায় না। সারাক্ষণ আঙুল, চোখ ও মস্তিষ্ক ব্যবহারের মধ্য দিয়ে তাদের মনের চাহিদা পূরণ করতে চায়। এক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহারই তাদের কাছে সহজ মনে হয়। ফলে নার্ভের সমস্যা হতে পারে। দীর্ঘ সময় শুয়ে অথবা বসে ভিডিও গেমস বা ফেসবুকিং করার ফলে হাঁটু এবং কোমরে ব্যথা দেখা দেয়। কায়িক পরিশ্রমের খেলাধুলা না করায় অল্প বয়সে তাদের শরীরে চর্বি জমে যায়। এতে করে লিভার, কিডনি সহ হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password